1. rajoirnews@gmail.com : ABDUL AZIZ : ABDUL AZIZ
  2. gopalganjbarta@gmail.com : ashik Rahman : ashik Rahman
  3. news.coxsbazarvoice@gmail.com : ABDUL AZIZ : ABDUL AZIZ
  4. jmitsolutionbd@gmail.com : jmmasud :
মুহিবুল্লাহ হত্যাকাণ্ড এবং রোহিঙ্গা সংকট - Coxsbazar Voice
শুক্রবার, ২২ অক্টোবর ২০২১, ০৬:২৮ পূর্বাহ্ন
দৃষ্টি দিন:
সম্মানিত পাঠক, আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। প্রতিমুহূর্তের সংবাদ জানতে ভিজিট করুন -www.coxsbazarvoice.com, আর নতুন নতুন ভিডিও পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল Cox's Bazar Voice. ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে শেয়ার করুন এবং কমেন্ট করুন। ধন্যবাদ।

মুহিবুল্লাহ হত্যাকাণ্ড এবং রোহিঙ্গা সংকট

  • প্রকাশিত : রবিবার, ১০ অক্টোবর, ২০২১, ৮.৪৪ এএম
  • ৩২ জন সংবাদটি পড়েছেন।

ইয়াহিয়া নয়ন:

দুনিয়াজুড়ে করোনা মহামারি আর আফগান তালেবান পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসন বিষয়টি ধামাচাপা পড়েছিল। তবে বাংলাদেশ সরকার সব সময়ই সরব ছিল। এ অবস্থায় গত ২৯ সেপ্টেম্বর এশার নামাজের পর রাত সাড়ে আটটার দিকে উখিয়ার লম্বাশিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিজের অফিসে বন্দুকধারীদের গুলিতে নিহত হন আলোচিত রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহ। যিনি যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। তাকে হত্যার পর বিশ্ব মিডিয়া এবং বিশ্ব নেতারা ফের দৃষ্টি ফিরিয়েছেন, রোহিঙ্গা সংকটের দিকে। চাইছেন মুহিবুল্লাহ হত্যার তদন্ত ও বিচার।

বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান চায়। তবে আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে তা করতে হলে অপর পক্ষকেও তা-ই চাইতে হবে এবং সে চাওয়াটা আমাদের হাতে নয়। যেকোনো পরিস্থিতির জন্য আমাদের প্রস্তুতি থাকতে হবে এবং আমাদের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে বিষয়টা মাথায় রাখতে হবে

মুহিবুল্লাহ রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের পক্ষে ছিলেন বলেই কিছু স্বার্থান্বেষী মহল তাকে হত্যা করেছে বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন। মন্ত্রীকে উদ্ধৃত করে এ তথ্য জানিয়েছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহ হত্যাকারীদের অবশ্যই বিচারের সম্মুখীন করা হবে। মুহিবুল্লাহ নিজ দেশ মিয়ানমারে ফেরত যেতে চেয়েছিলেন, সে কারণে কিছু স্বার্থান্বেষী মহল তাকে হত্যা করেছে। এ হত্যাকাণ্ডে যে বা যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে সরকার। এ ব্যাপারে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে আলোচিত ছিল একটি নাম মুহিবুল্লাহ। রোহিঙ্গাদের যত সংগঠন ও নেতা রয়েছেন তাদের সবাইকে ছাপিয়ে গেছেন মুহিবুল্লাহ। তার সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যানরাইটস। ইউএনএইচসিআরের কক্সবাজার অঞ্চলে নিয়োজিত কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক থাকা মুহিবুল্লাহ ছিলেন উখিয়া-টেকনাফের ৩২ রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরের একচ্ছত্র নেতা। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র গিয়ে সাক্ষাৎ করে আসার পর প্রত্যাবাসন কর্মসূচি প্রায় এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করে মুহিবুল্লাহ বিদেশি এনজিওগুলোকেও তার হাতের মুঠিতে নিয়ে নিয়েছিলেন। পরে লাখো রোহিঙ্গার সমাবেশ ঘটিয়ে আলোচনার তুঙ্গে এনেছিলেন নিজেকে। সবার প্রশ্ন- কে এই মুহিবুল্লাহ? কীভাবে তিনি ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গার এত বড় নেতা হয়ে গেলেন?

২০১৯ সালের আগস্টের প্রথম সপ্তাহে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে হঠাৎ করেই খবর আসে ২২ আগস্ট প্রত্যাবাসনের দিনক্ষণ ঠিক করেছে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার। বিদেশি বার্তা সংস্থা রয়টার্সের মিয়ানমার থেকে প্রকাশ করা এই খবরে শুধু উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোয় নয়, কক্সবাজার শহরে থাকা বিদেশি এনজিওগুলোর মধ্যেও তোলপাড় সৃষ্টি হয়। কারণ, তখন পর্যন্ত কক্সবাজারে অবস্থান করা কেউই এই দিনক্ষণের কথা জানতেন না। কারণ, মিয়ানমার থেকেই পুরোপুরি এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। বার্তা সংস্থার খবর প্রকাশের পরপরই তৎপর হয়ে ওঠে এনজিওগুলো। যোগাযোগ শুরু হয় আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যানরাইটসের নেতা মহিবুল্লাহর সঙ্গে। ইংরেজিতে দক্ষ মহিবুল্লাহর সেদিন থেকেই একদন্ড অবসর নেই। দিনে বিভিন্ন এনজিও প্রতিনিধির সঙ্গে আলোচনা-বৈঠক, বিকেল থেকে ভোররাত পর্যন্ত বিভিন্ন ক্যাম্পের ঘরে ঘরে ছুটে বেড়ান মহিবুল্লাহ। কাজে লাগান তার একনিষ্ঠ দুই হাজার কর্মীর নেটওয়ার্ক। রোহিঙ্গাদের বোঝান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শেখ হাসিনার পাঁচ দফা দাবির কথা। পরে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য সাড়ে তিন হাজারের তালিকা পাওয়ার পর তালিকায় থাকা প্রত্যেককে আলাদাভাবে পাঁচ দফা দাবির কথা মুখস্থ করান মুহিবুল্লাহ ও তার লোকেরা। যে কারণে প্রত্যাবাসনের সাক্ষাৎকার দিতে আসা প্রত্যেকেই দাবি আদায় না হলে, ফিরে না যাওয়ার কথা বলতে গিয়ে প্রায় একই কথা বলেছেন। দুপুরের এই ‘সফলতা’র পর ২২ আগস্ট বিকালেই মহাসমাবেশের জন্য নিজ নামে আবেদন করেন মুহিবুল্লাহ। ইংরেজিতে লেখা আবেদনপত্রে উল্লেখ করেন, কোন কোন ক্যাম্প থেকে কতজন কীভাবে এসে আয়োজিত হবে ৩ থেকে ৫ লাখ রোহিঙ্গার এ মহাসমাবেশ। পরে ২৫ আগস্টের এই মহাসমাবেশ তাক লাগিয়ে দেয় বাংলাদেশিদের এবং আনন্দে আত্মহারা করে রোহিঙ্গা ইস্যুতে লেগে থাকা বিদেশি এনজিওগুলোকে।

রোহিঙ্গাদের সশস্ত্র বাহিনী রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন ‘আরএসও’র ক্যাডার হিসেবে কাজ করার অভিযোগ ওঠার পর ১৯৯২ সালে মহিবুল্লাহ মিয়ানমার ছেড়ে বাংলাদেশে আসেন। এর পর থেকেই তিনি উখিয়ার ক্যাম্প ও আশপাশে বসবাস করছেন। বিংশ শতকের গোড়ার দিকে ১৫ জন সদস্য নিয়ে গড়ে তোলেন ‘আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যানরাইটস’ বা এআরএসপিএইচ। স্থানীয় বাংলাদেশি মানবাধিকারকর্মীদের সঙ্গেও গড়েন যোগাযোগ। ধীরে ধীরে মুহিবুল্লাহ প্রধান পাঁচ রোহিঙ্গা নেতার একজন হয়ে ওঠেন। দেশের বাইরে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে সফর করেন একাধিক দফায়। কিন্তু ২০১৭ সালে রোহিঙ্গার ঢল নামার পর পরিস্থিতি পাল্টে যেতে থাকে। সুস্পষ্টভাবে মুহিবুল্লাহর আজকের অবস্থানের মূল উত্থান হয় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে ২০১৮ সালে ইউএনএইচসিআরকে সংযুক্ত করার পর। রোহিঙ্গাদের বক্তব্য জানার চেষ্টা থেকেই মদদ পায় মুহিবুল্লাহর সংগঠন এআরএসপিএইচ। ইংরেজি ভাষা ও রোহিঙ্গাদের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগে দক্ষ মুহিবুল্লাহ ধীরে ধীরে প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠেন বিদেশিদের। ২০১৮-এর জুলাইয়ে র্যাব একবার মুহিবুল্লাহকে আটক করে উখিয়া থানায় নিয়ে যায়। কিন্তু প্রশাসনের নির্দেশে কোনো প্রকার রেকর্ড ছাড়াই তাকে থানা থেকে ছেড়ে দেয়া হয়। এরপর গত এক বছরে জাতিসংঘ মহাসচিবসহ যত বিদেশি প্রতিনিধি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গেছেন তাদের প্রত্যেকের সঙ্গেই রোহিঙ্গা প্রতিনিধি হিসেবে মুহিবুল্লাহ ও তার সঙ্গীদের সাক্ষাৎ করানো হয়েছে। এই মুহিবুল্লাহই মিয়ানমারের পররাষ্ট্র সচিবকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সংলাপের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ১৭ দেশের যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ২৭ প্রতিনিধি সাক্ষাৎ করেন সেখানেও যোগ দেন মুহিবুল্লাহ।

যুক্তরাষ্ট্রে এ সফর ও এর আগে একাধিক দফায় মধ্যপ্রাচ্য সফর করলেও মহাসমাবেশের আগে মুহ্বিুল্লাহর বিদেশযাত্রা নিয়ে তেমন কোনো আলোচনা হয়নি। মহাসমাবেশের পর সমালোচনা হলে কক্সবাজার প্রশাসনের সূত্রগুলো জানায়, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত আউটপাসের ওপর ভিসা ইস্যু করে নিজ দায়িত্বে সফর আয়োজন করে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্য দেশগুলো। পরে ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও তার এক্সিটপাসে বিদেশযাত্রার বিষয়টি নিশ্চিত করে।

স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি, ক্যাম্পগুলোয় মুহিবুল্লাহবিরোধী অন্য একটি সশস্ত্র গ্রুপও সক্রিয় রয়েছে। কিন্তু তারা সংখ্যায় কম, আর্থিকভাবে দুর্বল ও অস্ত্রশস্ত্রও তেমন নেই। এ কারণে মুহিবুল্লাহ গ্রুপের সমর্থিত ক্যাডাররা তাদের ‘কাফির’ বা বিশ্বাসঘাতক অভিহিত করে হত্যা করেছে। এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ৩২ জন ‘মোনাফেক’ হত্যার শিকার হয়েছেন এদের হাতে। আরেক পক্ষ থেকে মোনাফেক দাবি করে হত্যার বাইরে আরও কমপক্ষে ১০ রোহিঙ্গা হত্যার শিকার হয়েছে প্রভাবশালী গ্রুপটির কথার অবাধ্য হওয়ায়। এভাবে শতাধিক খুনের ঘটনা ঘটেছে পক্ষে-বিপক্ষে। সাধারণ রোহিঙ্গাদের মধ্যে শিক্ষিতদের তিনজন প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার পক্ষে কথা বলতে গিয়ে খুন হয়েছেন। তবে এটা গত ২০১৯ সালের ৫ নভেম্বরের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার আগে। এমনকি প্রভাবশালী গ্রুপটি নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে খুনের বাইরেও হুমকি-নির্যাতন চালায় হামেশায়। এমনকি বিদেশি এনজিগুলোর সাহায্য-সহযোগিতা বিতরণ প্রক্রিয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকা গোষ্ঠীটি ত্রাণও বন্ধ রাখে বিরোধিতাকারী পরিবারগুলোর। গোপনে সশস্ত্র গ্রুপটি পরিচালনা করা হলেও প্রকাশ্যে থাকে আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যানরাইটস। তাই তাদের কোনো কথার অবাধ্য হতে চায় না বা পারে না সাধারণ কোনো রোহিঙ্গাই।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ‘অতি জরুরি’ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, এ সংকট প্রশ্নে প্রধান আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর নিষ্ক্রিয়তায় বাংলাদেশ মর্মাহত। অথচ সীমিত সম্পদ সত্ত্বেও মানবিক দিক বিবেচনা করে বাংলাদেশ শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়েছিল। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকট আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতএব, এ ব্যাপারে জরুরি প্রস্তাব গ্রহণ করা প্রয়োজন।

গত ২৯ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের উচ্চপর্যায়ের এক আলোচনায় অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশের পৃষ্ঠপোষকতায় ‘হাইলেভেল সাইড ইভেন্ট অন ফরসিবলি ডিসপ্লেস মিয়ানমার ন্যাশনালস (রোহিঙ্গা) ক্রাইসিস : ইম্পারেটিভ ফর এ সাস্টেইনাবল সল্যুশন’ শীর্ষক ভার্চুয়াল বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।

ইউএজিএ’র গুরুত্বপূর্ণ সাধারণ আলোচনায় এ সংকট তুলে ধরতে ঢাকার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এ বৈঠকের আয়োজন করা হয়। রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক এবং তাদের অবশ্যই নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিয়ে জন্মভূমি মিয়ানমারেই ফিরে যেতে হবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তার আলোচনায় বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশে যা কিছু করছি তা সম্পূর্ণরূপে অস্থায়ী ভিত্তিতে।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, রোহিঙ্গাদের তাদের জন্মভূমিতে ফিরে যাওয়া নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যা কিছু করা সম্ভব তা অবশ্যই করতে হবে। এদিকে, তারা নিজেরাও তাদের নিজ দেশে ফিরে যেতে চায়। একইসঙ্গে, ন্যায় বিচার এবং দেশে প্রত্যাবর্তনে ভুক্তভোগী জনগোষ্ঠীর মধ্যে দৃঢ় আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা সম্প্রদায়কে নিপীড়নের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে প্রধানমন্ত্রী প্রচারণা চালানোর ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করেন।

শেখ হাসিনা বলেন, ২০১৭ সালে রোহিঙ্গারা দলে দলে বাংলাদেশে পালিয়ে আসার পর থেকেই এ সংকটের একটি স্থায়ী সমাধানের জন্য একেবারে ধারাবাহিকভাবে জাতিসংঘের অধিবেশনে তিনি সুনির্দিষ্ট বিভিন্ন প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। এ ব্যাপারে ‘আমাদের সরকার মিয়ানমারের সাথে দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগ বজায় রেখেছে। আঞ্চলিক ক্ষেত্রে, আমরা চীন ও ভারতসহ প্রধান শক্তিগুলোকে এ সংকট সমাধানে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করেছি। আমরা সার্বক্ষণিকভাবে আসিয়ানকে আরো সক্রিয় রাখার চেষ্টা চালিয়েছি।’

বহুপাক্ষিক ক্ষেত্রে, আমরা বিশ্বেও গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন দেশ ও জাতিসংঘ সংস্থাগুলোর মনোযোগ আকর্ষণ করে জাতিসংঘ প্রস্তাবের মাধ্যমে বিষয়টি আলোচনার টেবিলে ধরে রেখেছি। তবে, দুঃখজনকভাবে ‘দুর্ভাগা, গৃহহীন হয়ে পড়া মিয়ানমারের নাগরিকদের দেশে ফিরে যাওয়ার জন্য চালানো আমাদের প্রচেষ্টা এখন পর্যন্ত কোনো আলোর মুখ দেখেনি।’ তিনি বলেন, ‘আজ পর্যন্ত তাদের একজনও তাদের জন্মভূমিতে ফিরে যেতে পারেনি।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘বিগত ৪ বছর ধরে বাংলাদেশ অনেক আশা নিয়ে অপেক্ষা করে রয়েছে যে বাস্তুহারা এসব মানুষ নিরাপদে এবং মর্যাদাসহকারে তাদের নিজের দেশ মিয়ানমারে ফিরে যেতে পারবে। তা সত্ত্বেও, আমাদের আহ্বান অবহেলিত রয়ে গেছে এবং আমাদের প্রত্যাশা অসম্পূর্ণ রয়েছে। এ সংকটের পঞ্চম বছর চলছে। এখনো, আমরা রোহিঙ্গা সংকটের একটি স্থায়ী সমাধানের আশা রাখছি।’

প্রধানমন্ত্রী এই সংকট সমাধানে ৫ দফা আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন। এক্ষেত্রে প্রথমত, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ‘আমাদের সকলের জোরালো প্রচেষ্টা’ চালানো প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার অনিশ্চয়তা দূর করতে মিয়ানমারে রাজনৈতিক দৃশ্যপটের পরিবর্তন ঘটানো এবং এই সংকট সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টার একটি সংশোধন প্রয়োজন।

শেখ হাসিনা বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষিতে আসিয়ানের জোরদার প্রচেষ্টা দেখতে চান এবং ‘আমরা বিশ্বাস করি যে এক্ষেত্রে আসিয়ানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় তাদের পদক্ষেপ মিয়ানমারকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করবে।

‘চতুর্থত, আমাদের অবশ্যই মনে রাখা দরকার মানবিক সহায়তা জরুরি হলেও এটি কোন স্থায়ী সমাধান নয়। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন ও তাদের ধারণক্ষমতার জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরিতে জাতিসংঘ ও অংশীদারদের মিয়ানমারে অবশ্যই স্পষ্ট বিভিন্ন পদক্ষেপ ও প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। এখন পর্যন্ত আমরা এক্ষেত্রে কোন অগ্রগতি দেখতে পাইনি।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০১৭ সালে নিপীড়ন এড়াতে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে রোহিঙ্গাদের ব্যাপক আগমনের শুরুতে আমাদের করণীয় ছিল, তাদের জীবন বাঁচানো অথবা সীমান্ত বন্ধ করে দেয়া। সীমান্ত বন্ধ করে দিলে তারা জাতিগত নিধনের মুখে পড়তো। মানবতার দিক বিবেচনা করে আমরা তাদের জীবন বাঁচানোর পদক্ষেপ গ্রহণ করি।’ এই মানবিক সিদ্ধান্ত ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাংলাদেশের জনগণের নিজস্ব বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা ভিত্তিতে এবং বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নীতিতে অনুপ্রাণিত হয়ে গ্রহণ করা হয়।

শেখ হাসিনা উল্লেখ করেন, প্রতি বছর ৩০ হাজারের বেশি নতুন শিশু জন্মগ্রহণ করায় ক্যাম্পে জনসংখ্যার চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং কক্সবাজারে বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর চাপ কমাতে আমরা ভাসানচর নামের একটি দ্বীপে তাদের থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছি। দেশের দক্ষিণে অবস্থিত এ দ্বীপের ১৩ হাজার একর এলাকাজুড়ে এ ব্যবস্থা করা হয়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেখা দেয়া এই মানবিক সংকট সমাধান করা ছিল একটি সম্মিলিত দায়িত্ব এবং বিভিন্ন সীমান্তে এর প্রভাব পড়ছে। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এ ব্যাপারে অতি দ্রুত কিছু করতে ব্যর্থ হলে ‘আমাদের সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা মহাবিপদে পড়বে।’
যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাতিসংঘ শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা আয়োজিত এক ভার্চুয়াল সম্মেলনে ২০২০ সালের ২২ অক্টোবর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আশ্রিত রোহিঙ্গাদের যত দ্রুত সম্ভব তাদের দেশ মিয়ানমারে ফিরতে হবে।’ আর রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান শুধু প্রত্যাবাসনের মাধ্যমেই সম্ভব। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, সার্বভৌমত্ব ও সুরক্ষা প্রশ্নে বাংলাদেশ যেকোনো সিদ্ধান্ত নেবে। তাঁর মতে, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে জাতিসংঘ কাঠামো ব্যর্থ হয়েছে। তিনি মিয়ানমারের ভবিষ্যতের সঙ্গে যেসব রাষ্ট্র সম্পৃক্ত তাদের প্রতি সমস্যাটি সমাধানের ব্যাপারে মিয়ানমারকে রাজি করাতে আহ্বান জানান।

অন্যদিকে রোহিঙ্গাদের জন্য তহবিল সংগ্রহ ছাড়াও ওই সম্মেলনে রোহিঙ্গাদের ফেরার পরিবেশ সৃষ্টি, প্রত্যাবাসন এবং তাদের ওপর নির্যাতনের জবাবদিহি নিশ্চিতে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতার অধিকারী সদস্য চীনের ভূমিকা নিয়েও কথা হয়।

আমরা আশাবাদী এবং আমাদের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে সহমত, রোহিঙ্গাদের অবশ্যই ফিরিয়ে নিতে হবে, তাদেরকে তাদের ভিটামাটিতে পূর্ণ সম্মান ও নিরাপত্তা দিয়ে পুনর্বাসন করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। মিয়ানমারের সব ছলচাতুরীর অবসান ঘটিয়ে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনপ্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। ওদের ছলনা আর টালবাহানার সমাপ্তি ঘটাতে শিকড় কর্তন করতে হবে। আর এ কাজটি যত তাড়াতাড়ি করা যায়, ততই মঙ্গল। আর এ সব কিছু বিশ্বসম্প্রদায়কে সঙ্গে নিয়েই করতে হবে। আমরা অবশ্যই চাইব না, বাংলাদেশ মিয়ানমারের নাগরিক রোহিঙ্গাদের স্থায়ী আবাস হোক। রোহিঙ্গারা শিগগিরই তাদের ভিটেমাটিতে ফিরে যাক এবং সেখানে নিরাপদে মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে সম্মানের সঙ্গে বসবাস করুক এটিই আমাদের একমাত্র প্রত্যাশা।

সবশেষে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে দীর্ঘসূত্রতায় আশাহত হলে চলবে না। আমাদের মেনে নিতে হবে যে এ সংকট নিরসনে ১০, ১৫ বা ২০ বছর লেগে যেতে পারে আর সে জন্য মানসিক এবং বাস্তব প্রস্তুতি নিতে হবে। আমাদের দেখতে হবে যে শরণার্থীরা যেন একটা সহনীয় জীবনযাপন করতে পারে, সেই সঙ্গে এই এলাকার স্থানীয় মানুষের সমস্যা সমাধানে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে তাদের মধ্যে ইতিমধ্যে সৃষ্ট অসন্তোষ ও বিরূপ মনোভাব নিরসন করা যায়।

বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান চায়। তবে আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে তা করতে হলে অপর পক্ষকেও তা-ই চাইতে হবে এবং সে চাওয়াটা আমাদের হাতে নয়। যেকোনো পরিস্থিতির জন্য আমাদের প্রস্তুতি থাকতে হবে এবং আমাদের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে বিষয়টা মাথায় রাখতে হবে।

লেখক : সাংবাদিক।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2020
Design & Developed by : JM IT SOLUTION