1. rajoirnews@gmail.com : ABDUL AZIZ : ABDUL AZIZ
  2. gopalganjbarta@gmail.com : ashik Rahman : ashik Rahman
  3. news.coxsbazarvoice@gmail.com : ABDUL AZIZ : ABDUL AZIZ
  4. jmitsolutionbd@gmail.com : jmmasud :
তালেবানদের হাতে বন্দি আমি: বুঝলাম মৃত্যু ভয় কী! - Coxsbazar Voice
শনিবার, ১৯ জুন ২০২১, ০৬:২৯ অপরাহ্ন
দৃষ্টি দিন:
সম্মানিত পাঠক, আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। প্রতিমুহূর্তের সংবাদ জানতে ভিজিট করুন -www.coxsbazarvoice.com, আর নতুন নতুন ভিডিও পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল Cox's Bazar Voice. ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে শেয়ার করুন এবং কমেন্ট করুন। ধন্যবাদ।

তালেবানদের হাতে বন্দি আমি: বুঝলাম মৃত্যু ভয় কী!

  • প্রকাশিত : শুক্রবার, ১৪ মে, ২০২১, ৭.২৭ পিএম
  • ৩৬ জন সংবাদটি পড়েছেন।
আনিস আলমগীর।

আনিস আলমগীর:

দিনটি ছিল ১১ নভেম্বর ২০০১। কাবুলের তখনও পতন হয়নি। তালেবানদের কর্তৃত্ব থেকে নর্দার্ন অ্যালায়েন্সের হাতে মাজার-ই শরীফ অবস্থা যায় যায়। দেশের বাকি অঞ্চলে তখনও তাদের দাপটের রাজত্ব। বেলুচিস্তানের রাজধানী কুয়েটা থেকে আমি পাকিস্তানের সীমান্ত শহর চামন-এ আশ্রয় নিয়েছি। শহর বলা ভুল হবে। কারণ, সে শহরের কেন্দ্রে সবচেয়ে ভালো হোটেল ‘ইত্তেফাক’-এ যখন আমার জায়গা হলো, দেখলাম হোটেল কক্ষে তোয়ালে নেই। শহরের সেরা হোটেলের অবস্থা দিয়ে বুঝতে পারেন শহরটি কেমন। সীমান্তের আমদানি রফতানি নিয়ে ব্যস্ত এই এলাকার লোকজনের মধ্যে শহুরে ভাবও নেই। যেদিকে তাকাই শুধু দাড়ি-গোঁফওয়ালা পাঠান। ইয়া বড় বড় শরীরের মানুষ। ছোট বড় সবার গায়ে ট্র্যাডিশনাল পাঠানি স্যুট- যাকে আমরা কাবলি বলে চিনি।

বিদেশি সাংবাদিকদের সীমান্ত শহরে আসা নিষেধ। সেই নিষেধ উপেক্ষা করে যখন চামনে গেলাম, আমার ভয় শুধু পাকিস্তানি গোয়েন্দাদের। কিন্তু যেখানে বাঘের ভয় সেখানে রাত পোহায়- এ প্রবাদ সত্য হলো আমার ক্ষেত্রেও। শহরের যে ব্যবসায়ী লোকটির সঙ্গে প্রথম পরিচয় তার অফিসেই জেরার মুখে পড়লাম উপস্থিত গোয়েন্দা কর্মকর্তার হাতে। পরে তারা আমার হোটেলে গিয়ে আমার জিনিসপত্র চেক করলেন। ভদ্রভাবে জানিয়ে দিলেন এখানে থাকা চলবে না। শিগগির চলে যেতে হবে কুয়েটায়, যেখানে সব বিদেশি সাংবাদিকের সঙ্গে আছি।

কে শুনে কার কথা! পরদিন সকালে আফগানিস্তানমুখী অসংখ্য মানুষের সঙ্গে মিশে, প্রায় এক কিলোমিটার রাস্তায় একে একে চারটি নিরাপত্তা চৌকি, পাক-আফগান চামন সীমান্তের নো-ম্যান্স ল্যান্ডের শেষ মাথায় পাকিস্তানের শেষ সিকিউরিটি গার্ডকে এড়িয়ে যখন আফগানিস্তানের মাটিতে পা দিয়ে স্বস্তির নিশ্বাসটা ফেললাম, তা শেষ হতে দিলো না সশস্ত্র যুবক। আমার ডান হাতটি শক্ত করে ধরে শীতল কণ্ঠে জানতে চাইলো..‘কাঁহাসে আয়্যা’। আমি ভাষাই হারিয়ে ফেললাম তার জবাব দেওয়ার জন্যে। শরীরের সব লোম খাঁড়া হয়ে গেলো তার প্রশ্নে। তার সঙ্গে জুটেছে সশস্ত্র আরও তিন/চার জন। সবার অস্ত্র প্রকাশ্য এবং কাঁধে ঝুলানো। এ জাতীয় বিপদ হতে পারে শংকা যে ছিল না তা নয়, তবে তা এত তাড়াতাড়ি হবে ভাবতেই পারিনি। জবাব দেওয়ার আগেই তার আরেক প্রশ্ন- কোথায় যাবে?

জীবনের জন্যে এত মায়া আমার বোধহয় আর কখনও হয়নি। সাংবাদিকতা জীবনে তো নয়ই, ব্যক্তিগতভাবেও এত ভয় আমি আগে কাউকে পেয়েছি কিনা স্মরণ করতে পারি না। মনে পড়লো, আমার মায়ের দোয়া- আল্লাহকে স্মরণ করো। চিন্তা হলো, চামনের হোটেলে রেখে আসা আমার ল্যাপটপ, টাকা পয়সা, জিনিসপত্রের কী হবে! আমার খবর কীভাবে জানবে তারা! আর মনে পড়লো পূর্বরাতে আমার হোটেলে এসে আফগানিস্তান না যাওয়ার জন্যে পাকিস্তান গোয়েন্দা কর্মকর্তার পরামর্শ। এই সীমান্ত দিয়ে আসা একজন আমেরিকান সাংবাদিককে তালেবানদের হত্যা করার গল্প, যে নাকি ভালো পার্সি, পশতু ভাষা জানতো। কিন্তু পুরোপুরিই মার্কিনি। গুপ্তচর সন্দেহে তালেবানরা তাকে হত্যা করেছে।

বয়স আর কত হবে আমার হাত ধরে রাখা হালকা পাতলা যুবকের। ২৪ কিংবা ২৫। দাড়ি গোঁফ রাখায় এদের এমনিতে বয়স্ক দেখায়। কথা বলছে সে খুব নিম্নস্বরে। কিন্তু তা এত শীতল যে আমার মাথার চুল খাঁড়া হয়ে গেছে। হতভম্ব হয়েই মুখ খুললাম- মোহাজের (শরণার্থী) দেখতে এসেছি। এখানে মোহাজের ক্যাম্প কোথায়? আমার মোহাজের দেখার শখ তার সন্দেহকে যেন এবার প্রবল করে তুললো। আমার মুখের ভাঙা উর্দু শুনে সে এবার উর্দুতে টেনে টেনে বললো, ‘আচ্ছা, মোহাজের দেখতে এসেছো। তা কেন দেখতে এসেছো? তোমার কী কাজ তাদের দেখে? আর কোথায় যেতে চাও? তোমার মুল্লুক (দেশ) কোথায়?

এমনিতে মিথ্যা বলি না। আমি কে তারা সহজে জানতে পারবে আমার সঙ্গে রাখা পাসপোর্ট, কাগজপত্র দেখলে। বললাম, বাংলাদেশ থেকে এসেছি। আমার নাম আনিস। সে বললো, আচ্ছা। তোমাদের মুল্লুকতো মুসলমানের, তাই না? বললাম, হ্যাঁ। আমাদের দেশে আফগানিস্তানের লোকদের জন্যে অনেক মসজিদে দোয়া হয়েছে। অনেকে মিছিল করছে। তোমরা কি সেটা জান? সে ঠান্ডা গলায় বললো, শুনেছি। তোমাদের অনেক ভাইও আমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। তবে এখানে তাদের কেউ নেই। তুমি কারও দেখা পাবে না।

কথা বলতে বলতে যুবক আমাকে টেনে আনছিলো সীমান্তের আরও ভেতরে। বললো, চলো তোমার সঙ্গে কথা আছে। আমাকে ঘিরে থাকা অন্য যুবকরা ইশারায় ওকে বললো, নিয়ে যা। আমার পা চলছিল না। বললাম, কোথায় নিচ্ছ? জবাব দিলো, চলো সামনে চলো। আমাকে অনেকটা ধাক্কা মেরে সামনে চলতে বাধ্য করছে সে।

আমার মুখের উর্দু শুনে চামনে এক পাঠান অফিসার বলেছিলেন, আমি নাকি তাদের জবানকে জবাই করছি। সশস্ত্র যুবকও মনে হলো আমার পরিমাণে উর্দু জানে। ফলে আমাদের মধ্যে কমিউনিকেশন গ্যাপ চলছে। দু’তিনবার বলে তাকে বুঝাতে সক্ষম হলাম আমার ভয় হচ্ছে। তুমি কোথায় নিয়ে যাচ্ছ? আমি তোমাদের অফিসারের সঙ্গে কথা বলতে চাই। আমাকে সেখানে নিয়ে যাও। আমার চিন্তা হলো, অন্তত ইংরেজিতে বড় কর্তাকে আমার উদ্দেশ্য বোঝানো যাবে।

এরইমধ্যে আমাদের পেছনে উৎসুক জনতার স্রোত লেগেছে। পেছনে তাকিয়ে এদের দেখে ভয়ের সঙ্গে আমার এবার লজ্জাও লাগছে। যেন চোর ধরা পড়েছে এমন ব্যাপার। মুখে হাসি আনার চেষ্টা করে যুবককে বললাম, আমার হাত ছেড়ে দাও। আমি কোথায় পালাবো! এটা তো তোমাদের মুল্লুক। সে সদয় হয়ে আমার হাত ছেড়ে দিলো।

আমরা দু’পাশে অসংখ্য ছোট ছোট ঝুপড়ি মার্কা দোকান রেখে বড় রাস্তা ধরে হাঁটছি। এ রাস্তাটি এখান থেকে কান্দাহারের দিকে চলে গেছে। ১৯৯৪ সালের অক্টোবরে কান্দাহার দখলের মধ্য দিয়েই তালেবানরা তাদের ক্ষমতার যাত্রা শুরু করে। কান্দাহারকে বলা যায় তাদের প্রধান ঘাঁটি। আর এখান থেকে ১২ কিলোমিটার স্পিনবলদেক নামক আরেকটি ছোট বাজার আছে, যেখানে যুদ্ধের কারণে বাস্তুভিটা ত্যাগে বাধ্য প্রায় এক লাখ লোক আশ্রয় নিয়েছে। আমার প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল সেখানে যাওয়া। প্রায় আধা কিলোমিটার হাঁটার পর সশস্ত্র যুবক এবার বামে মোড় নিলো। পথে পথে তাদের সশস্ত্র এবং অস্ত্র ছাড়া লোকদের প্রশ্নের জবাবে, কখনও বা নিজ থেকে পশতু ভাষায় জানিয়েছে যে আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি। দু’একবার ‘মেহমান’ শব্দও উচ্চারণ করেছে।

বড় রাস্তা থেকে কিছু দূর গিয়েই পাশে ছোট ছোট কয়েকটি একতলা ঘর। মনে হলো অফিস ঘর। তারই একটিতে কর্তা মতো একজন রুমের সামনে জুতা খুলে ঢুকলেন। আমাকে অনুসরণ করতে ইশারায় নির্দেশ দিলেন। একটি মাত্র রুম। খুব বড় না। রুমের মেঝেতে চাটাই বিছানো কিন্তু চারপাশে দেয়াল ঘেঁষে গদি লাগানো। আরাম করে বসার জন্যে বালিশও আছে। সাদা পাগড়ির যুবক বয়সী কর্মকর্তা দক্ষিণ দেয়ালে হেলান দিয়ে বসলেন। ওই পাশে তিনি একা। আমাকে তার কাছে এসে পশ্চিম দেয়ালের গদিতে বসতে বললেন। তার চেহারা দেখে বোঝার উপায় নেই তিনি আমাকে কীভাবে নিচ্ছেন। তবে চেহারায় ভদ্রতার ছাপ আছে। আমরা পরস্পর মুখোমুখি হয়ে কথা বলছি। তিনি শিগগির আবিষ্কার করলেন আমি পশতু জানি না। তিনি উর্দু, ইংরেজি জানেন বলেও আমার মনে হলো না। আমার উত্তর শুনে বারবার আমাকে পশতুতে প্রশ্ন করে নিজেই কিছুটা বিব্রত হচ্ছেন। নির্দিষ্ট একজন কর্মকর্তাকে ডেকে আনার নির্দেশ দিলেন এক কর্মীকে। এর মধ্যে বাকি দু’দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসে পড়েছে অন্যরা। এদের কারও কাছে অস্ত্র আছে, কারও কাছে নেই। সবাই যুবক। মাথায় কালো পাগড়ি।

সাদা পাগড়িওয়ালা আমার নাম জিজ্ঞেস করলেন। কোথা থেকে এসেছি জানতে চাইলেন। আমার ভাঙা উর্দু বয়ান তার জন্যে তরজমা করে দিচ্ছে আরেক জন। বাংলাদেশ বলায় তিনি তার সহকর্মীর কাছে জানতে চাইলেন- কোথায় এটা? বারবার জানতে চাইলেন, এটা মুসলিম দেশ কিনা। তার কথা বার্তায় চালাকি বা ভান নেই, এ সম্পর্কে তিনি অজ্ঞই মনে হলো। বাংলাদেশ নামে একটি দেশ আছে, যেটা মুসলমান অধ্যুষিত, এটা যেন তার বিশ্বাসই হয় না। আমাদের পাশে ভারত এবং মিয়ানমার আছে- এটাও তাকে বললেন তার সহকর্মী।

আমি তার পরিচয় জানতে চাইলে আমাদের ভাষা তরজমাকারী তার পদবি জানালেন। আমি শব্দটার মানেই বুঝিনি। তবে এটা বুঝতে পারলাম, তিনি এখানকার প্রধান। এরিয়া কমান্ডার জাতীয়। নাম ক্বারি আবদুল বশির। সীমান্ত দেখাই হচ্ছে তাদের সবার কাজ। আমি জিজ্ঞেস করলাম এখানে তালেবান কারা? প্রশ্নটি অনেকের কাছে হাস্যকর হলেও আমার জন্য জরুরি ছিল। কারণ, আমার কাছে আফগানিস্তানের সব লোককেই মনে হয় একই রকম- তালেবান। এদের কোনও সামরিক ড্রেসও আমার চোখে ধরা পড়েনি এ পর্যন্ত। যেমন আসার পথে পাকিস্তানের সীমান্ত প্রহরী ফ্রন্টিয়ার কোরের সদস্যদের গায়ে, যাদের মিলিশিয়া বলেও ডাকা হয়, তাদের নির্দিষ্ট ড্রেস দেখেছি। এদের তেমন কোনও ড্রেস নেই। মনে হচ্ছে যে যার মতো রঙের ড্রেস পরেছে। একজন বললো, আমরাই তালেবান। আমাকে বুঝিয়ে দিলো যাদের মাথায় কালো পাগড়ি আছে তারই তালেবান। এবার লক্ষ করে দেখলাম কালো রঙের একটা ড্রেস আছে এদের।

তালেবান কমান্ডার ক্বারি আবদুল বশির আমার সরকারি আইডি কার্ড চাইলেন। বললাম আমাদের তেমন আইডি নেই। পাসপোর্ট দেখতে পারেন। তিনি পাসপোর্ট চেয়ে নিলেন। পাতার পর পাতা উল্টিয়ে দেখলেন। ছবি দেখলেন। ছবিসহ মার্কিন ভিসাতে তার চোখ গেলো। একজনকে সঙ্গে সঙ্গে নির্দেশ দিলেন আমার শরীর চেক করতে। একজন তালেবান সশস্ত্র যুবক আমাকে দাঁড়াতে বললো এবং আমার পাকিস্তানি সাজ- কাবলি স্যুট এবং হাতাকাটা কোট হাতালো। বর্ডার ক্রস করার জন্যে জীবনে এই প্রথম আমি পাকিস্তানের এই ট্রেডিশনাল সলোয়ার কামিজ পরেছি। আমার হোটেলের ম্যানেজার তার ব্যবহৃত ড্রেসটি ভোরে দিয়েছিলেন আমার উদ্দেশ্য জেনে। আমার নিজের কাছে একটি পাগড়ির কাপড় আছে কিন্তু তিনি পরামর্শ দিয়েছিলেন আমার পাগড়ি নিরাপত্তা কর্মীদের কাছে সন্দেহজনক হবে। এখানে ইংরেজ হোক আর জাপানি হোক সব বিদেশিকে বলে ইংরেজ। আর পাঠান না হলে পাকিস্তানের যেখান থেকে আসুক পাঞ্জাবি। সে ক্ষেত্রে চেহারার কারণে আমি নাকি তাদের চোখে পাঞ্জাবি। পাঞ্জাবিরা এ পাগড়ি পরে না। এটা পরে পাঠানরা।

আমার শরীর হাতানোর পর আবারো বললাম, আমার ভয় করছে। আপনারা আমাকে ছাড়বেন তো? কমান্ডার মুচকি হেসে বললেন, ‘তুমি ভয় করছে আমাদের আর আমাদের ভয় করছে তোমাকে। তুমি কেন এসেছ এখানে? তুমি কি জানো না এটা আফগানিস্তান। এখানে আসতে ভিসা লাগবে তোমার।’ আমি বললাম, আমি মোহাজের দেখতে এসেছি। আমেরিকার বোমায় আফগান আওয়ামের (জনতা) কী অবস্থা তা দেখতে এসেছি। আমাদের দেশের লোক আপনাদের দেশের হাল দেখে খুব ব্যথিত। তারা তাদের মুসলমান ভাইদের অবস্থা জানতে চায়। আমাকে আমার পত্রিকা পাঠিয়েছে আপনাদের সংবাদ জানানোর জন্যে। তারপরও ঘুরিয়ে ফিরিয়ে তার একই ধরনের প্রশ্ন- ‘তুমি কেন এসেছ? বর্ডার ক্রস করলে কীভাবে? তোমার সঙ্গে আর কে কে আছে? তারা কোথায়?’

যে যুবকটিকে কমান্ডার ডেকেছিলেন তিনি এসে বসেন আমার পাশে। ক্বারি বশির আমার পাসপোর্টটি তাকে দেন পরীক্ষা করতে। যুবকটি ইংরেজি বুঝে। জানালেন তিনি কমান্ডারের সেক্রেটারি। তার চোখও পড়ে আছে আমার মার্কিন ভিসার ওপর। তবে তারা কেউ এ নিয়ে কোনও প্রশ্ন করেননি। সেক্রেটারি বললেন, আপনি দেখছি ইরান গিয়েছেন। বললাম, হ্যাঁ আরব আমিরাতও গিয়েছি। ভিসা দেখুন (ইউ.এ.ই তালেবানদের স্বীকৃতি দিয়েছিল, হয়তো তাদের মন গলতে পারে এই ভেবে যোগ করলাম)। আমার প্রতিষ্ঠানের কার্ড চাইলেন।

পিআইডির সরবরাহকৃত অ্যাক্রিডিটেশন কার্ডটি তার হাতে দিলাম। যেটুকু বুঝলাম সেক্রেটারি দীর্ঘক্ষণ আমার কাগজপত্র দেখে তার বসকে তাদের ভাষায় জানান, আমি সাংবাদিক তাতে সন্দেহ নেই। এক ফাঁকে আমি এও বলি, আপনারা তো কোরআন বিশ্বাস করেন, কোরআন দিন আমি ছুঁয়ে বলি, আমি আপনাদের বা অন্য কারও ক্ষতি করতে আসিনি।

কমান্ডার আমার পাসপোর্টটি তার পকেটে রেখে দেন। তারা নিজের মধ্যে আলোচনা করেন। আমার মনে হচ্ছিল তারা আমাকে এবার ছেড়ে দেবেন। কিন্তু প্রক্রিয়াটি কী তা জানি না। আবার মনে হচ্ছে ছাড়বেন না। আমার পাসপোর্টটি কেন সে নিজের পকেটে ঢুকিয়ে রেখেছেন।

আমি বর্ডার ক্রস করে আসার সময় একটি বিষয় নিশ্চিত হয়েছি- পাকিস্তান থেকে কারা যাচ্ছে এটা নিয়ে পাকিস্তান সিকিউরিটি ফোর্স যতটা উদ্বিগ্ন, আফগানিস্তান থেকে পাকিস্তানে কারা আসছে এটা নিয়ে তাদের উদ্বেগ তারচেয়ে বেশি। একই বিষয় আফগানিস্তানের জন্যেও প্রযোজ্য। তারাও আমার মতো কারা আফগানিস্তানে আসছে তাদের দেখছে। সেখান থেকে কারা পাকিস্তান যাচ্ছে তেমন খেয়াল রাখছে না। আমি নির্বিঘ্নে পাকিস্তান প্রবেশ করবো কীভাবে এটাই হলো আমার আরেক দুশ্চিন্তা। আমি বারবার অনুরোধ করলাম আমাকে মিলিশিয়াদের হাতে তুলে দেবেন না। কারণ, তাদের কথাবার্তায় এমন গন্ধও আমি পাচ্ছিলাম। তারা আমার অনুরোধ রেখেছেন।

কমান্ডার ক্বারি আবদুল বশির এবং তার আরেক সহকর্মী বন্ধু মেহমুদ আমাকে বললেন, গাড়িতে উঠো। প্রথমে ভেবেছিলাম সীমান্তের কোনও চোরাগোপ্তা পথ দিয়েই আমাকে পার করার জন্য নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমাকে অবাক করে তারা চলতে লাগলেন সদর রাস্তা ধরে। নো-ম্যান্স ল্যান্ডে এসে কি যেন বলল পশতু ভাষায়। তুলে দেওয়া হলো কাঁটাতারের বাধা। মেহমুদ হুড খোলা জিপ গাড়ি চালিয়ে চললেন চামনের দিকে।

পাকিস্তান ফিরেই আমি মুখ খুলেছিলাম। তারা যেটুকু জানালেন- সীমান্ত পার হওয়া তাদের জন্য কোনও ব্যাপার না। আমার হাসি পাচ্ছিল পত্র-পত্রিকায় প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ এবং তার মিত্রদের বয়ানে চালানো রিপোর্টগুলোর কথা মনে করে, যেখানে বলা হয়েছে তালেবানরা যাতে না ঢুকতে পারে সেজন্য জন্য পাকিস্তানের বর্ডার সিল করে দেওয়া হয়েছে। তাই বলে এটাও ভাবার কারণ নেই, পাকিস্তান সরকার তালেবানদের পাকিস্তানে প্রবেশের ক্ষেত্রে বর্ডার উন্মুক্ত করে রেখেছিল। আসলে দু’পারের মানুষের জাতিগত ও সামাজিক বন্ধন এত দৃঢ়, ব্রিটিশের টানা সীমান্তরেখা তাকে রোধ করার কোনও শক্তিই রাখে না।

কমান্ডার বশির তাদের গাড়িটা আমার হোটেলের সামনেই রেখেছিলেন। আমার অনুরোধে হোটেলের রুমে গিয়ে তাদের সঙ্গে ছবি তোলার সুযোগও দিলো। কারণ, এতক্ষণ আমার সঙ্গে কোনও ক্যামেরা ছিল না। মুক্ত হয়ে আমি তাদের নতুন চোখে দেখলাম। মনে হলো, তারাও আমাকে নিরাপদ এবং বন্ধু ভাবতে শুরু করেছেন, যেহেতু আমি মুসলমান মুল্লুক থেকে এসেছি। ধরা পড়লে তাকে যতটা কঠিন মানুষ ভেবেছিলাম এবং ভয় পেয়েছিলাম, ততটা সে নয়। চেহারায় ক্রোধ আছে সত্য, পাশাপাশি কিছুটা লাজুকতাও আছে। আমি কমান্ডারকে কান্দাহার যাওয়ার ব্যবস্থা করতে বলায় বিনয়ের সঙ্গে অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন।

যখন বিদায় নিচ্ছি, কমান্ডার বশিরের কাছে জানতে চাইলাম- আমেরিকার কাছে এত আধুনিক অস্ত্র, এত সৈন্য, যুদ্ধে আপনারা কীভাবে জিতবেন বলে আশা করেন? তার দৃঢ় জবাব- ‘আমেরিকা আমাদের কী করতে পারবে! আমাদের সঙ্গে তো আল্লাহ আছেন। আল্লাহ দেখবেন আমাদের।’

আমার তাকে পাল্টা কোনও প্রশ্ন করার ইচ্ছে হলো না। আমার চোখে ভেসে উঠলো পাকিস্তানের বিখ্যাত মাসিক পত্রিকা ‘ হেরাল্ড’-এ তাদের নিয়ে করা চলতি সংখ্যার কাভার স্টোরি- “আল্লাহ’স আর্মি?”

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।
anisalamgir@gmail.com

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2020
Design & Developed by : JM IT SOLUTION