1. rajoirnews@gmail.com : ABDUL AZIZ : ABDUL AZIZ
  2. gopalganjbarta@gmail.com : ashik Rahman : ashik Rahman
  3. news.coxsbazarvoice@gmail.com : ABDUL AZIZ : ABDUL AZIZ
  4. jmitsolutionbd@gmail.com : jmmasud :
অবৈধ ইসরায়েলের আগ্রাসন ও মুসলিম উম্মাহর নেতাদের নীরবতা - Coxsbazar Voice
শনিবার, ১৯ জুন ২০২১, ০৬:৩৩ অপরাহ্ন
দৃষ্টি দিন:
সম্মানিত পাঠক, আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। প্রতিমুহূর্তের সংবাদ জানতে ভিজিট করুন -www.coxsbazarvoice.com, আর নতুন নতুন ভিডিও পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল Cox's Bazar Voice. ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে শেয়ার করুন এবং কমেন্ট করুন। ধন্যবাদ।

অবৈধ ইসরায়েলের আগ্রাসন ও মুসলিম উম্মাহর নেতাদের নীরবতা

  • প্রকাশিত : রবিবার, ১৬ মে, ২০২১, ১.২৪ পিএম
  • ৪৪ জন সংবাদটি পড়েছেন।

মো. জাকির হোসেন:

করোনার তাণ্ডবের মাঝে বিশ্বব্যাপী মুসলমানরা যখন সীমিত পরিসরে ঈদ উদযাপনের প্রস্তুতি গ্রহণ করছে, ফিলিস্তিনি মুসলমানরা তখন আগ্রাসী ইসরায়েলের কামান আর বিমান থেকে বোমাবৃষ্টির ভয়ে প্রাণ নিয়ে এদিক-সেদিক দৌড়াচ্ছে। বিশ্বের অন্য মুসলমানরা যখন পরিবার-পরিজন নিয়ে ঈদের দিনের আনন্দ উপভোগ করছেন, ফিলিস্তিনিরা তখন মৃত স্বজনের লাশ দাফন কিংবা বোমা-গুলিতে ক্ষতবিক্ষত স্বজনদের প্রাণ বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে। হামাসের কিছু সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধা ছাড়া নিরস্ত্র ফিলিস্তিনিদের ওপর দখলদার ইসরায়েলের আগ্রাসনে মাত্র ১৬০টি জঙ্গি বিমানের পাশাপাশি অত্যাধুনিক ট্যাংক, কামান, ড্রোন, গানবোট থেকে বোমা-গোলা-ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হচ্ছে। ইহুদি আগ্রাসনের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতা মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন যখন ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলের আগ্রাসনকে আত্মরক্ষার অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে পাশে থাকার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন মুসলিম উম্মাহ’র নেতারা তখন তাদের ইহুদি-নাসারা প্রভুদের খুশি রাখতে মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ইসরায়েলকে দখলদার হিসাবে উল্লেখ করে ইসরায়েলের সাম্প্রতিক অভিযানকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হিসাবে অভিহিত করেছেন। নামাজরত মুসল্লি ও বেসামরিক নাগরিকদের ওপর ইসরায়েলের আক্রমণকে আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের চরম লংঘন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী ঘোষণা করে স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবিও পুনর্ব্যক্ত করেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। কেউ কেউ হয়তো বলবেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান তো ইসরায়েলকে কঠিন শাস্তি দেওয়ার কথা বলেছেন, ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি নিপীড়নে তুরস্ক চুপ থাকবে না বলে হুমকি দিয়েছেন। তাদের বিনয়ের সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম মুসলিম-প্রধান দেশ তুরস্ক। ১৯৪৯ সালে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়া তুরস্ক দীর্ঘ ছয় দশক দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছিল ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে। ২০০২ সালে এরদোয়ান ক্ষমতায় আসার আগে দেশ দুটি বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা ও পর্যটন খাতে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছিল। ক্ষমতায় আসার পর এরদোয়ান ২০০৫ সালে শান্তির বার্তা নিয়ে ইসরায়েল সফরও করেছিলেন। ২০১০ সালে খাদ্য-ওষুধ সহায়তা নিয়ে গাজামুখী নৌকা ‘মাভি মারমারা’য় হামলা চালিয়ে ইসরায়েল নয় তুর্কি নাগরিক ও এক আমেরিকান-তুর্কি সহায়তা কর্মীকে হত্যা করায় দুই দেশের দীর্ঘ ৬০ বছরের সম্পর্ক তলানিতে এসে ঠেকে। তবে ২০১৮ সালে জেরুসালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে প্রতিবাদ হিসেবে ইসরায়েল থেকে রাষ্ট্রদূত সরিয়ে নেয় তুরস্ক। দেশ দুটিতে একে অপরের দূতাবাস থাকলেও শীর্ষ পর্যায়ের কূটনীতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে তেল আবিব ও আঙ্কারা। তারপরও দেশ দুটির মধ্যে বাণিজ্য চলেছে পুরোদমে।

গত আট বছরে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য হয়েছে দেশ দু’টির মধ্যে। তার মানে প্রতিবছর বাণিজ্য হয়েছে ছয় বিলিয়ন ডলারের মতো। অতি সম্প্রতি তুরস্কের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বরাত দিয়ে ইসরায়েলের হেইমন সংবাদপত্র জানিয়েছে, তেলআবিবে একজন রাষ্ট্রদূত পাঠানোর কথা গত ২৯ মার্চ ইসরায়েলকে জানিয়েছে তুরস্ক। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-মনিটর জানিয়েছে, ‘ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করতে গবেষক উফুক উলুতাসকে রাষ্ট্রদূত করে তেলআবিবে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে তুরস্ক।’ একদিকে ইসরায়েলকে হুমকি অন্যদিকে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক পুরোদস্তুর চালিয়ে যাওয়ার এ দ্বিচারিতা দিয়ে ইসরায়েলকে কেমনে কঠিন শাস্তি দেওয়া যাবে তা পাঠকরাই বিবেচনা করবেন। যে তুরস্কের এত হম্বিতম্বি, সেই তুরস্ক আসলে কী করছে? তুরস্কের সামরিক বাহিনী ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম শক্তি।

অনেকে এরদোয়ানকে মুসলিম বিশ্বের নেতা হিসেবে, মুসলিম বিশ্বের কর্ণধার হিসেবে, মুসলিম বিশ্বের নতুন সালাহউদ্দিন আইয়ুবী হিসেবে অভিহিত করে থাকেন। তুরস্ক লিবিয়ায়, সিরিয়ায়, ইরাকে, আজারবাইজানে, সোমালিয়ায়, এমনকি ইউক্রেনেও লড়াই করছে বিশ্বের অনেক পরাশক্তির বিরুদ্ধে কিন্তু ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কোনও অ্যাকশন নেই তুরস্কের। এরদোয়ান মুখে হাঁকডাক করলেও তলে তলে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামত করছেন।

শিরোনামে আমি ইসরায়েলকে অবৈধ বলেছি। এর পেছনে কী যুক্তি আছে? অবশ্যই ইসরায়েল অবৈধ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর উসমানীয় সাম্রাজ্যের দক্ষিণ সিরিয়া অংশ থেকে আলাদা করা ফিলিস্তিন ব্রিটিশ প্রশাসনের অধীনে পরিচালিত একটি ভৌগোলিক অঞ্চল ছিল। ১৯২০ থেকে ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ব্রিটিশ বেসামরিক প্রশাসন ফিলিস্তিন পরিচালনা করে। ব্রিটিশরা ১৯২২ সালের জুন মাসে বিলুপ্ত লীগ অব নেশনস থেকে ফিলিস্তিনের জন্য কর্তৃত্ব লাভ করে। স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে অভ্যুদয়ের পূর্বে অন্তবর্তীকালীন সময়ের জন্য ফিলিস্তিনের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা ব্রিটিশ সরকারের অভিবাবকত্বের অধীন করা হয়। লীগ অব নেশনস-এর গঠনতন্ত্রের ২২নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ব্রিটেনকে এই কর্তৃত্ব দেওয়া হয়। সাবেক উসমানীয় সাম্রাজ্যের অধিকৃত অঞ্চলগুলো নিজের পায়ে দাঁড়ানোর আগ পর্যন্ত পরিচালনার জন্য কর্তৃত্ব প্রদান প্রথা চালু করা হয়েছিল লীগ অব নেশনস-এর গঠনতন্ত্রের ২২নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী। লীগ অব নেশনস-এর গঠনতন্ত্রের ২২নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “To those colonies and territories which as a consequence of the late war have ceased to be under the sovereignty of the States which formerly governed them and which are inhabited by peoples not yet able to stand by themselves under the strenuous conditions of the modern world, there should be applied the principle that the well-being and development of such peoples form a sacred trust of civilisation and that securities for the performance of this trust should be embodied in this Covenant. The best method of giving practical effect to this principle is that the tutelage of such peoples should be entrusted to advanced nations who by reason of their resources, their experience or their geographical position can best undertake this responsibility, and who are willing to accept it, and that this tutelage should be exercised by them as Mandatories on behalf of the League. The character of the mandate must differ according to the stage of the development of the people, the geographical situation of the territory, its economic conditions and other similar circumstances.

Certain communities formerly belonging to the Turkish Empire have reached a stage of development where their existence as independent nations can be provisionally recognized subject to the rendering of administrative advice and assistance by a Mandatory until such time as they are able to stand alone. The wishes of these communities must be a principal consideration in the selection of the Mandatory………..”

লীগ অব নেশনস কর্তৃক ব্রিটেনকে কর্তৃত্ব প্রদত্ত দুটি অঞ্চল ছিল। একটি জর্ডান নদীর পশ্চিম অংশ যা ফিলিস্তিন বলে পরিচিত ছিল। এই অংশ ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত সরাসরি ব্রিটিশ শাসনের অন্তর্ভুক্ত ছিল। আরেকটি অংশ ছিল পূর্ব তীরের ট্রান্সজর্ডান যা আধা স্বায়ত্তশাসিত হিসেবে পরিচালিত হচ্ছিল। ট্রান্সজর্ডান ১৯৪৬ সালে স্বাধীনতা লাভ করে ১৯৪৮ সালে নাম বদলে জর্ডান রাখা হয়। কিন্তু ফিলিস্তিনের জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে ব্রিটেন। তৎকালীন ব্রিটিশ শাসকরা ১৯১৭ সালে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে একটি ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়। সেই সময়ের ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার জেমস বেলফোর-এর নাম অনুসারে এটি বেলফোর ঘোষণা হিসেবে খ্যাত। ইহুদি রাষ্ট্র বাস্তবায়ন করতে ব্রিটিশ শাসকরা বিপুল সংখ্যক ইহুদি ইউরোপ থেকে ফিলিস্তিনে এনে জড়ো করতে থাকে। ১৯০৫ থেকে ১৯১৪ সাল পর্যন্ত ফিলিস্তিনে ইহুদিদের সংখ্যা ছিল মাত্র কয়েক হাজার। কিন্তু ১৯১৪ সাল থেকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ১৯১৮ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশদের সহযোগিতায় ফিলিস্তিনে ইহুদিদের সংখ্যা ২০ হাজারে উন্নীত হয়। এরপর প্রকাশ্যে ফিলিস্তিনে ইহুদি অভিবাসীদের ধরে এনে জড়ো করা শুরু হলে ১৯১৯ থেকে ১৯২৩ সাল নাগাদ ফিলিস্তিনে ইহুদিদের সংখ্যা ৩৫ হাজারে পৌঁছে যায়। ১৯৩১ সালে ইহুদিদের এই সংখ্যা প্রায় ৫ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে ১ লাখ ৮০ হাজারে পৌঁছায়। এভাবে ফিলিস্তিনে ইহুদি অভিবাসীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে থাকে এবং ১৯৪৮ সালে সেখানে ইহুদিদের সংখ্যা ৬ লাখে উন্নীত হয়। ১৯১৮ সালে ব্রিটেনের সহযোগিতায় গুপ্ত ইহুদি সন্ত্রাসী বাহিনী ‘হাগানাহ’ গঠিত হয়। এ বাহিনী ইহুদিবাদীদের রাষ্ট্র তৈরির কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। হাগানাহ-র পাশাপাশি ইরগুন ও স্ট্যার্ন গ্যাং হত্যা, সন্ত্রাস, ধর্ষণ আর ধ্বংসযজ্ঞের মাধ্যমে নিরীহ ফিলিস্তিনদের বাধ্য করে নিজ মাতৃভূমি ছেড়ে চলে যেতে। ফিলিস্তিনিদের জমিজমা ইহুদিরা দখল করে নেয়। ১৯২২ সালে ইসরায়েলে ইহুদি ছিল মাত্র ১২ শতাংশ, ১৯৩১ সালে তা হয় ২৩ শতাংশ, আর ১৯৪৭ এ তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩২ শতাংশে। ব্রিটিশদের পর ফিলিস্তিনের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রতিষ্ঠিত জাতিসংঘ। ফিলিস্তিন বিষয়ে লীগ অব নেশনস কর্তৃক ব্রিটিশ সরকারকে প্রদত্ত কর্তৃত্বের শর্ত ও বিলুপ্ত লীগ অব নেশনসের গঠনতন্ত্রের ২২নং অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করে জাতিসংঘ। ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘের উদ্যোগে সাধারণ পরিষদে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডকে দ্বিখণ্ডিত করা সংক্রান্ত ১৮১ নম্বর প্রস্তাব গৃহীত হয়। প্রস্তাব অনুযায়ী ৪৫ শতাংশ ফিলিস্তিনিদের এবং বাকি ৫৫ শতাংশ ভূমি ইহুদিবাদীদের দিয়ে মুসলমান ও ইহুদিদের জন্য দু’টি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেয়। আরব রাষ্ট্রসমূহ জাতিসংঘের এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে বলে যে, কেবল ফিলিস্তিনকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে রূপান্তরই ম্যান্ডেটের উদ্দেশ্যের যৌক্তিক পরিণতি লাভ করবে ও জাতিপুঞ্জের সনদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। আরব রাষ্ট্রসমূহ জাতিসংঘকে সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে, ফিলিস্তিনকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃতি প্রদান ব্যতীত সাধারণ পরিষদের আর কোনও সুপারিশ করার এখতিয়ার নেই। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মতামতকে উপেক্ষা করে ফিলিস্তিনকে বিভক্ত করা জাতিসংঘ সনদের নীতিমালার পরিপন্থী এবং নতুন রাষ্ট্র সৃষ্টি করার এখতিয়ার জাতিসংঘের নেই। সাধারণ পরিষদ কোনও বৈশ্বিক সরকার নয়, কোনও রাষ্ট্রের জনগণের সম্মতি ব্যতিরেকে ওই রাষ্ট্রকে ভাগ করার, বিধিবিধান তৈরি করার, কোনও চুক্তি চাপিয়ে দেওয়ার এখতিয়ার সাধারণ পরিষদের নেই। এদিকে ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী সংস্থা Arab Higher Committee ১৯৪৮ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘ মহাসচিব বরাবরে এক লিখিত আবেদনে জানায় যে, ফিলিস্তিন বিভাজনের সিদ্ধান্ত জাতিসংঘের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের পরিপন্থী। জাতিসংঘ সনদের কোথাও সাধারণ পরিষদকে কোনও রাষ্ট্র বিভাজন করে নতুন রাষ্ট্র সৃষ্টির ক্ষমতা প্রদান করা হয়নি। ফলে সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্ত আইন ও ক্ষমতা-বহির্ভূত বিধায় বাতিল। Arab Higher Committee ফিলিস্তিন বিষয়ে আইনগত মতামতের জন্য বিষয়টি আন্তর্জাতিক আদালতে প্রেরণেরও দাবি জানায়। কিন্তু সাধারণ পরিষদ আন্তর্জাতিক আদালতের মতামত গ্রহণের বিষয়টি কখনোই পরিষদের আলোচ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করেনি। এমতাবস্থায় Arab Higher Committee জাতিসংঘকে জানিয়ে দেয় ফিলিস্তিনি জনগণের মতামতকে অগ্রাহ্য করে জবরদস্তিমূলক বিভাজন করে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হলে Committee তাকে আগ্রাসন বলে বিবেচনা করবে এবং আত্মরক্ষার্থে শক্তি প্রয়োগ করে হলেও এ অবৈধ সিদ্ধান্ত প্রতিহত করবে। নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতি চীনের প্রতিনিধি মত দেন যে, নিরাপত্তা পরিষদ সৃষ্টি করা হয়েছে বিশ্ব শান্তি বজায় রাখার জন্য। এটি খুবই দুঃখজনক হবে, রাষ্ট্রভাগের নাম করে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়ে জাতিসংঘ নিজেই যদি যুদ্ধের কারণ হিসেবে আবির্ভূত হয়। এমন পরিস্থিতিতে ব্রিটিশ সরকার ১৫ মে ১৯৪৮ তারিখে ফিলিস্তিনের ওপর লীগ অব নেশনস কর্তৃক প্রদত্ত তাদের কর্তৃত্বের (ম্যান্ডেট) অবসানের ঘোষণা দেয়। ব্রিটিশ সরকারের ম্যান্ডেট অবসানের সময়সীমার মধ্যে প্যালেস্টাইন বিষয়ে কোনও সিদ্ধান্ত না হলে ব্যাপক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কা করা হয়। এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি ওয়ারেন অস্টিন প্রস্তাব করে –

এক. ব্রিটিশ ম্যান্ডেট অবসানের পর প্যালেস্টাইনের বিষয়ে তদারকি করার জন্য একটি ট্রাস্টিশিপ গঠন করা হোক যাতে আরব ও ইহুদিরা আরও আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে মতৈক্যে পৌঁছার সুযোগ পায়।

দুই. উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বিশেষ অধিবেশন আহ্বান করে সমাধানের নতুন উদ্যোগ নেওয়া হোক।

তিন. বিশেষ অধিবেশনের সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রভাগের পরিকল্পনা স্থগিত রাখতে U.N. Palestine Commission কে নিরাপত্তা পরিষদের পক্ষ থেকে নির্দেশ দেওয়া হোক।

অন্যদিকে, কানাডার প্রতিনিধি আরও বিকল্প খোঁজার আহ্বান জানান। এমনকি সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও অধিকারের নিশ্চয়তা বিধান করে এক রাষ্ট্র সমাধানকেও কানাডা সমর্থন করে বলে কানাডার প্রতিনিধি নিরাপত্তা পরিষদের সভায় মত দেন।

এমন পরিস্থিতিতে ইহুদিদের সংগঠন Jewish Agency for Palestine-এর পক্ষ থেকে প্যালেস্টাইনের তদারকির জন্য কোন ট্রাস্টিশিপ গঠনকে সরাসরি নাকচ করে দেওয়া হয় এ মর্মে যে, এটি ইহুদিদের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় বাধা। উদ্বেগাকুল এমন পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের সিদ্ধান্তের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে ১৪ মে ১৯৪৮ সালে ইহুদিরা একতরফা ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়। তাদের ঘোষণার ভিত্তি হিসেবে সাধারণ পরিষদের ১৮১নং সিদ্ধান্তকে উল্লেখ করে যেখানে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের কথা রয়েছে। সাধারণ পরিষদের যে ১৮১ নং সিদ্ধান্তকে ইসরায়েল ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছে তা নিরাপত্তা পরিষতে অনুমোদিত হয়নি। তদুপরি এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বিশেষ অধিবেশন আহ্বানের অপেক্ষায় ছিল জাতিসংঘ। আমাদের বাংলাদেশে ভূমিদস্যু বা ভূমিখেকোরা যেমন অন্যের জমি জোর করে দখল করে নিয়ে নিজের নামে সাইনবোর্ড টাঙিয়ে আবাসিক, বাণিজ্যিক প্লট, ভবন তৈরি করে মালিক বনে যায়, আন্তর্জাতিক ভূমিদস্যু ইসরায়েলও তেমনই ফিলিস্তিনিদের জমি-বাড়ি-ব্যবসা প্রতিষ্ঠান জোর করে দখল করে নিয়ে নাম দিয়েছে ইসরায়েল। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী একটি রাষ্ট্র গঠনের জন্য ন্যূনতম চারটি উপাদানের উপস্থিতি আবশ্যক। এগুলো হলো- একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী, একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, একটি কার্যকর সরকার ও সার্বভৌমত্ব। ইহুদিদের একটি জনগোষ্ঠী থাকলেও অন্য তিনটি উপাদান অনুপস্থিত ছিল। যে ভূখণ্ডে ইসরায়েল রাষ্ট্র ঘোষিত হয়েছে তা ছিল ফিলিস্তিনিদের। ১৪ মে ইসরায়েল রাষ্ট্র ঘোষণা করা হলেও সেই রাষ্ট্রের তখনও কোনও সরকার ছিল না।

ইসরায়েল রাষ্ট্রের জন্মের ৩ দিন পর (১৭ মে ১৯৪৮) ড্যাভিড বেন গুরিয়ন দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। সরকারবিহীন ও অন্যের মালিকানাধীন ভূখণ্ডে সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন অবান্তর। আশপাশের আরব দেশগুলো ইসরায়েলের এ সিদ্ধান্ত মেনে না নিয়ে হামলা চালালে ইসরায়েল, ফিলিস্তিনের পুরোটাই দখল করে নেয় (শুধু গাজা মিসরের দখলে, এবং পশ্চিম তীর জর্ডানের দখলে ছিল)। আরব এবং ইসরায়েলের মধ্যে ক্রমাগত তিক্ততা এবং সীমান্তে ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ১৯৬৭ সালে আবার আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হয়। পাঁচ দিনের যুদ্ধে মিসর, সিরিয়া এবং জর্ডানের সেনাবাহিনী ইসরায়েলের কাছে পরাস্ত হয়। ইসরায়েল গাজা উপত্যকা, মিসরের সিনাই মরুভূমি, সিরিয়ার গোলান মালভূমি এবং জর্ডানের কাছ থেকে পশ্চিম তীর এবং পূর্ব জেরুসালেম দখল করে। অবৈধভাবে প্রতিষ্ঠিত হলেও ইসরাইল জাতিসংঘের প্রস্তাবিত ৫৬ শতাংশ ভূমির বাইরে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রর জন্য প্রস্তাবিত এলাকায় নতুন ইহুদি বসতি নির্মাণ শুরু করে। ইতোমধ্যে সাবেক ফিলিস্তিনের ৮০ শতাংশ দখল করে নিয়েছে। গত ৫০ বছর ধরে ইসরায়েল এসব দখলীকৃত জায়গায় ইহুদি বসতি স্থাপন করে যাচ্ছে। ছয় লাখের বেশি ইহুদি এখন এসব এলাকায় থাকে। ফিলিস্তিনিরা বলছে, আন্তর্জাতিক আইনে এগুলো অবৈধ বসতি এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে অন্তরায়। তবে ইসরায়েল তা মনে করে না। পূর্ব জেরুজালেম, গাজা এবং পশ্চিম তীরে যে ফিলিস্তিনিরা থাকেন, তাদের সঙ্গে ইসরায়েলিদের উত্তেজনা প্রায়শই চরমে ওঠে। সম্প্রতি পূর্ব জেরুসালেম থেকে কিছু ফিলিস্তিনি পরিবারকে উচ্ছেদের হুমকি ফিলিস্তিনিদের আরও ক্ষুব্ধ করে তোলে। রমজানের শুরু থেকে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। তখন প্রায় প্রতি রাতেই ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ চলছিল। এরই পরিণতি চলমান ভয়ংকর রক্তক্ষয়ী আগ্রাসন।

বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমান ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধান হলো দখলদার ইসরাইলকে মেনে নেওয়া। তবে শর্ত হলো, জাতিসংঘের ১৮১নং প্রস্তাব অনুযায়ী ৪৫ শতাংশ ভূমিতে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা মেনে নিতে হবে ইসরাইলকে। ইসরাইলের আগ্রাসী মনোভাবের কারণে এই সমাধান সম্ভব হবে বলে প্রতীয়মান হয় না। এর ফলে ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের ঘরবাড়ি ফেরত দিতে হবে; পশ্চিম তীরের ইহুদি বসতি সরিয়ে নিতে হবে; জেরুসালেম নগরী কারও ভাগে না দিয়ে আন্তর্জাতিক তদারকিতে ছেড়ে দিতে হবে কিংবা উভয়ের মধ্যে ভাগাভাগি করতে হবে; সর্বোপরি ইসরায়েলের পাশাপাশি একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। গত ২৫ বছর ধরেই শান্তি আলোচনা চলছে থেমে থেমে। কিন্তু সংঘাতের কোনও সমাধান এখনও মেলেনি। শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে ইসরায়েলকে ১৮১নং প্রস্তাব মানতে হবে যার সম্ভাবনা একবারেই ক্ষীণ। ইসরায়েলের সঙ্গে রয়েছে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, এমনকি ভারতও। তাই ইসরায়েল কোনও কিছুই পরোয়া করে না। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ইসরাইলের দুর্বৃত্তপনা বন্ধে কোনও ব্যবস্থা না নিলেও মুসলমানদের দায়িত্ব রয়েছে রাষ্ট্রহারা ও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শরণার্থী হিসেবে অন্য রাষ্ট্রের অনুকম্পায় বেঁচে থাকা ফিলিস্তিনিদের সাহায্য করা। এ বিষয়ে তাদের জবাবদিহি রয়েছে স্বয়ং স্রষ্টার কাছে। পবিত্র কোরআনে এ বিষয়ে বর্ণিত হয়েছে, “তোমাদের কি হয়েছে যে, তোমরা আল্লাহর পথে এবং অসহায় নরনারী ও শিশুদের (উদ্ধারের) জন্য সংগ্রাম করবে না? যারা বলছে, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! অত্যাচারী অধিবাসীদের এই নগর থেকে আমাদের বাহির করে অন্যত্র নিয়ে যাও এবং তোমার নিকট হতে কাউকে আমাদের অভিভাবক করো এবং তোমার নিকট হতে কাউকে আমাদের সহায় নিযুক্ত করো।” (সুরা নিসা: ৭৫)। যারা ফিলিস্তিনিদের কয়েক দশকের ভয়ংকর দুর্দশা থেকে মুক্তি দিয়ে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করতে পারতেন সেসব মুসলিম শাসকদের মধ্যে রয়েছে ভয়ংকর অনৈক্য ও অবিশ্বাস। আর অধিকাংশই ফিলিস্তিনিদের তাদের নিজ ভূখণ্ড থেকে বিতাড়নকারী, নির্যাতনকারী, এমনকি মুসলিমদের প্রথম কিবলা পবিত্র আল আকসা মসজিদে আক্রমণকারী ইসরাইল ও তাদের দোসরদের বন্ধু বানিয়েছেন নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে। তাই ইসরাইলের ভয়ংকর আগ্রাসনে অসহায়, বিপন্ন ফিলিস্তিনিদের আহ্বানে সাড়া না দিয়ে নিরাপদে সাইডলাইনে বসে নীরবতা পালন করছেন।

লেখক: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

ই-মেইল: zhossain1965@gmail.com

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2020
Design & Developed by : JM IT SOLUTION